ডেভলপার কোম্পানিকে পাওয়ার দেওয়ার পূর্বে যে সকল বিষয় বিবেচনা করবেন



বেশিরভাগ জমির মালিক ডেভলপার কোম্পানির সাথে জয়েন ভেঞ্চারে চুক্তির ক্ষেত্রে সাইনিং মানি কত টাকা পাবেন এই বিষয়ই অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এই বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ এর পাশাপাশি আরো বেশ কিছু বিষয় থাকে যা জয়েন ভেঞ্চার চুক্তির পূর্বে বিশেষ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ।

Md.Shafiul Islam Rayhan (Real Estate Consultant)


একজন জমির মালিক হিসাবে প্রথমেই আপনার জেনে নেওয়া প্রয়োজন কোন আইনের উপর ভিত্তি করে আপনার জমি একটি ডেভলপার কোম্পানির কাছে পাওয়ার দিচ্ছেন এবং যৌথ মালিকানায় বাড়ি নির্মাণ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন। মূলত পাওয়ার অফ এ্যাটোনি ২০১২রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এই দুটি আইনের উপর ভিত্তি করে করে ডেভলপার কোম্পানির সাথে জমির মালিকের চুক্তিবদ্ধ হতে হয়। কাজেই এই দুইটি আইনের সকল ধারা-উপধারা গুলো আপনার ভালোভাবে জেনে নেওয়া প্রয়োজন এবং একজন রিয়েল এস্টেট এক্সপার্ট এর সহায়তা নিয়ে চুক্তিবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় ডেভলপার কোম্পানি যখন সাইনিং মানি এবং প্রপারটি রেশিওতে সম্মত হয় তখন জমির মালিক তাদের দেওয়া এগ্রিমেন্টে স্বাক্ষর করে থাকেন।এক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় দেখা যায় ডেভলপার কোম্পানী গুলো তাদের সুবিধার্থে সকল ধরনের সুবিধা লিখে চুক্তিপত্র তৈরি করে থাকে যা একজন জমির মালিকের অনেক অধিকার থেকে কৌশলগতভাবে বঞ্চিত করে।
কোন ডেভেলপার কোম্পানির সাথে পাওয়ার দেওয়া ও চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পূর্বেই জমির বেশ কিছু ডকুমেন্টে আপডেট করে নেওয়া প্রয়োজন । জমি যে সকল ডকুমেন্ট আপডেট করা প্রয়োজন তার ধারাবাহিক হচ্ছে : জমির মূল দলিল অথবা সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করা , সকল ভায়া দলিল, ফাইনাল এলোটমেন্ট লেটার, মিউটেশন ও খাজনা পরিশোধের রশিদ উল্লেখযোগ্য।
এবার জেনে নেওয়া যাক কি কি বিষয়ে বিবেচনা করে ডেভেলপার কোম্পানির সাথে যৌথ মালিকানায় বাড়ি নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হবেন।

জমির ভ্যালু অনুযায়ী সাইনিং মানি নির্ধারণ করা  : আপনার জমির আশেপাশের জমির মালিক এই সময়ে কেমন সাইনিং মানি পাচ্ছেন এ বিষয়ে সঠিক ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে সকল ডেভলপার কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালু বেশি তারা তুলনামূলক কম সাইনিং মানি দিয়ে থাকে। সাইনিং মানির চেয়ে ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রজেক্ট ঠিকমতো নির্মাণ করা এবং সঠিক সময় হ্যান্ড ওভার করা। আপনার জমির সম্মুখে রাস্তার প্রশস্ত, জমির আয়তন ও ফেইস, আশেপাশের নাগরিক সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিবেচনা করে সাইনিং মানি নির্ধারিত হয়ে থাকে। যা একজন রিয়েল এস্টেট কনসালটেন্ট এর কাছ থেকে সঠিক ধারণা পাবেন।অনেককে সাইনিং মানি বেশি পাবার আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করে থাকেন এটাও বুদ্ধিমানের কাজ না। কারণ আপনি যত তাড়াতাড়ি বাড়ীটি হ্যান্ড ওভার বুঝে পাবেন ততো তাড়াতাড়ি আপনার মাসিক ভাড়া দিতে পারবেন এবং নিজে থাকতে পারবেন।আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ছোট বা নতুন কোম্পানি সাইনিং মানি বেশি অফার করতে পারে এক্ষেত্রেও যথেষ্ট সতর্ক থাকা দরকার। কারণ তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়িটি ঠিক মতো নির্মাণ করতে পারবে কিনা এবং ফ্ল্যাট বিক্রি না হলেও বাড়ির কাজ শেষ করার মত আর্থিক সামর্থ্য আছে কিনা এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক থাকা প্রয়োজন । এর জন্য সবচেয়ে ভালো হয় ডেভলপার র‍্যাংকিং চেক লিস্ট মেনটেইন করে একজন রিয়েল এস্টেট কনসালটেন্ট এর মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

ডেভলপার কোম্পানিদের সম্পর্কে ধারণা ও বাজার বিশ্লেষণ : আপনার জমির জয়েন্ট ভেঞ্চারে ডেভেলাপ করার মত তিন থেকে পাঁচটি কোম্পানি নির্বাচন করতে হবে । আপনার জমি যদি তিন কাটা বা তার চেয়ে ছোট হয় সে ক্ষেত্রে বড় কোম্পানি আগ্রহ দেখাবে না, আবার বড় কোম্পানির আগ্রহ দেখালেও ছোট জমির জন্য বড় কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ না হয়াই ভালো। কারণ বড় কোম্পানিগুলো ছোট প্রজেক্টে সাইনিং মানি যেমন দিতে চায় না, তেমনি নির্মাণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আপনার জমিটি জয়েন ভেঞ্চারে ডেভেলপমেন্ট করার জন্য কোন কোন ডেভলপার কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে এবং সঠিক সময়ে হ্যান্ড ওভার করতে পারবে এ বিষয়ে একজন রিয়েল এস্টেট এক্সপার্ট এর সহযোগিতা নিতে পারেন।

ডেভলপার কোম্পানির প্রজেক্ট ভিজিট, মিটিং এবং নেগোসিয়েশন  : আপনার জমি ডেভেলপ করার মত যে সকল কোম্পানির সিলেকশন করা হবে তাদের মধ্যে যারা প্রাথমিক অবস্থায় মিটিং করতে আগ্রহী সেই সকল ডেভলপার কোম্পানির হ্যান্ড ওভার প্রজেক্ট এবং অন গোয়িং প্রজেক্ট ভিজিট করতে হবে। তাদের কাজের ধরন, কোয়ালিটি,আর্কিটাকচারাল ভিউ, হেভি ইকুপমেন্ট (লিফট, জেনারেটর, সাবস্টেশন ইন্টার কম) ভালো ভাবে অবজারভেশন করতে হবে এর পাশাপাশি কাস্টমার সার্ভিস, আফটার সেল সার্ভিস, মার্কেটিং টিম এই বিষয়গুলোও ধারনা নেওয়া প্রয়োজন।প্রজেক্ট ভিজিটের পর যে সকল কোম্পানি ভালো মনে হবে তাদের সাথে সরাসরি তাদের অফিসে গিয়ে কোম্পানির মালিকের সাথে নির্মাণ প্রক্রিয়া, কতদিন সময় লাগবে, সাইনিং মানি কত টাকা দিবে ,নির্মাণ মালামালের গুণগত মান ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করে প্রতিটা কোম্পানির কার্যপ্রণালী,অন্যান্য অন গোয়িং প্রজেক্ট এর এক্টিভিটিস, ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট এবং মার্কেটিং এবং সেলস সম্পর্কে সামগ্রিক ভাবে ধারণা নিতে হবে।

সঠিক কোম্পানি নির্বাচন করা : বেশ কয়েকটি ডেভলপার কোম্পানির সাথে মিটিং করার পর একজন রিয়েল এস্টেট কনসালটেন্ট এর সহায়তা নিয়ে ডেভলপার রেংকিং চেক লিস্ট মেনটেইন করে সঠিক ডেভলপার কোম্পানী নির্বাচন করতে হবে। কনসালটেন্ট বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার এর উপর ভিত্তি করে প্রত্যেকটির আলাদা স্কোর করে সবকিছু সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ স্কোর যাদের হবে তাদের সাথে পুনরায় মিটিং করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ।


পাওয়ার প্রদান করা এবং চুক্তিবদ্ধ হওয়া :কোম্পানি নির্বাচন করার পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পাওয়ার ও চুক্তির রেজিস্ট্রেশন করা। এক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় এগ্রিমেন্টে উল্লেখ করতে হবে যেমন : কি কি প্রোডাক্ট দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করবেন, কতদিনে নির্মাণ করবেন, কোন কোন ফ্লোর জমির মালিক এবং ডেভলপার পাবে, কে কতটা পার্কিং পাবেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হ্যান্ড ওভার করতে না পারলে পরবর্তী ছয় মাস কত টাকা করে ভাড়া প্রদান করবেন এরকম আরো অনেকগুলো বিষয় নথিভুক্ত হবে যা অল্প কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সয়েল টেস্ট, ডিজাইন এন্ড ড্রইং, পাইলিং এর কাজ করার জন্য অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নির্দিষ্ট কোম্পানি এগ্রিমেন্টে উল্লেখ করে দিতে হবে। কারণ অনেক সময় অল্প টাকা বাঁচানোর জন্য ডেভলপার কোম্পানি অনভিজ্ঞ বা অল্প টাকায় কাজ করে এমন কোম্পানিকে নিয়োগ করে থাকেন।কোন কোন প্রতিষ্ঠান সয়েল টেস্ট, পাইলিং, ড্রয়িং ডিজাইনে বাজারে সুনাম আছে তার সঠিক ধারণা রিয়েল এস্টেট পরামর্শকের মাধ্যমে পেয়ে যাবেন। মনে রাখতে হবে প্রতিটা এগ্রিমেন্ট ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে এখানে কোন কপি পেস্ট করে এগ্রিমেন্ট স্বয়ং সম্পূর্ণ হবে না। সাধারণত যেদিন পাওয়ার প্রদান করা হয় ওইদিনই সাইনিং মানি ডেভলপাররা প্রদান করে থাকে। তবে ল্যান্ড বড় হলে এবং টাকার পরিমান বেশি হলে অনেক ডেভলপার কোম্পানি দুইবারে সাইনিং মানি দিয়ে থাকে।

পাওয়ার দেওয়ার পর করনীয় : এগ্রিমেন্ট হওয়ার পর আরো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনিটরিং করা প্রয়োজন।ডেভলপার কোম্পানি যথা সময়ে ল্যান্ড ক্লিয়ারেন্স ও রাজুউক প্লেন পাশ এপ্রুভাল নিয়ে আসলো কিনা। আর্কিটেকচার ডিজাইন ও ফ্লোর লেআউট এ সকল বিষয় অবশ্যই জমির মালিকের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এছাড়া কোয়ালিটি কন্ট্রোল, সয়েল টেস্ট, পাইলিং, ফাউন্ডেশন সহ টোটাল কনস্ট্রাকশন স্ট্রাকচারাল ডিজাইন অনুযায়ী করছে কিনা এর জন্য জমির মালিকের পক্ষ থেকে একটি কনসালটেন্সি ফার্ম অথবা পার্ট টাইম সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। সে প্রতিদিন কাজের প্রক্রিয়া অগ্রগতি নির্মাণ সামগ্রীর কোয়ান্টিটি ও কোয়ালিটি সম্পর্কে জমির মালিককে অবগত করবে। ফিনিশিং লেবেলে চুক্তি অনুযায়ী সকল ধরনের ফিটিং, ইলেক্ট্রো মেকানিক্যাল আইটেম ও হেভিকুভমেন্ট (লিফট, জেনারেটর, পাম্প, সাবস্টেশন, ইন্টার কম) ইনস্টল করছে কিনা সেটা মনিটরিং করতে হবে ।
আপনার জমি যে এলাকায় সেই এলাকার যদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন (রাস্তা, বিদ্যুৎ,ওয়াসা,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ) ইতিমধ্যে হয়ে থাকে তবে দেরি না করে ডেভলপার কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়াটাই ভালো। অনেক সময় জমির মালিক বেশি টাকা সাইনিং মানি পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে থাকেন যা বুদ্ধিমানের কাজ না। কারণ আপনার বাড়িটা যদি চার বছর আগে হ্যান্ডওভার হয় সেই ক্ষেত্রে আপনি চার বছর আগে থেকে ভাড়া দিতে পারবেন এবং নিজে থাকতে পারবেন।আবার অনেক জমির মালিক মনে করেন আমার জমিটি এখন বড় কোন ডেভলপার কোম্পানি নিচ্ছে না কিন্তু ভবিষ্যতে নেবে এটাও বাস্তবায়ন নাও হতে পারে কারণ এলাকার ডেভেলপমেন্টের সাথে সাথে সব জমি কমবেশি ভ্যালু বাড়বে। এখন যেহেতু একটা ভালো ব্র্যান্ড কোম্পানি নিচ্ছে না ভবিষ্যতে নেওয়ার সম্ভাবনা কম।

পরিশেষে এটাই বলা যায়, একজন সচেতন জমির মালিক হিসাবে ডেভলপার কোম্পানি সিলেকশনের জন্য অবশ্যই একজন রিয়েল এস্টেট কনসালটেন্ট এর সহায়তা নিয়ে নির্দিষ্ট চেকলিস্ট মেইনটেইন করে এগ্রিমেন্ট করা প্রয়োজন। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য যে, যিনি রিয়েল এস্টেট সেক্টরের সবগুলো শাখা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন আপনি শুধু উনারই পরামর্শ নিবেন। কারণ আপনার জমিটি কোন ডেভেলপারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে হ্যান্ড ওভার বুঝে পাওয়া পর্যন্ত অনেক ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে শেষ হয়। এখানে পরামর্শক হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করতে হবে যার অবশ্যই বিভিন্ন কোম্পানির কমিটমেন্ট এবং নির্মাণ কোয়ালিটি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে এর পাশাপাশি লিগ্যাল বিষয়, ল্যান্ড ভ্যালুয়েশন, এগ্রিমেন্ট ড্রাফট, ডিজাইন অ্যান্ড ড্রইং, নির্মাণ প্রক্রিয়া ও নির্মাণ সামগ্রীর কোয়ালিটি এই সবগুলো বিষয়েও স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। অন্যথায় উনি আপনাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে পারবেন না ।


Writer : Md.Shafiul Islam Rayhan (Real Estate Consultant )
D&P: 18/06/2025, Afroza Begum Road, Block# L ,Bashundhara R/A










একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ